হজ্ব একটি আরবি শব্দ। এর শাব্দিক অর্থ হল ইচ্ছা করা দৃঢ় সংকল্প করা ইত্যাদি। আর শরীয়তের পরিভাষায় মহান আল্লাহ তাআলার সান্নিধ্য অর্জনের লক্ষ্যে নির্দিষ্ট সময়ে নিদিষ্ট কাজ সম্পাদনের মাধ্যমে বাইতুল্লাহ শরীফ জিয়ারত করাকে হজ বলে। ইসলামী শরীয়তে পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। প্রত্যেক সামর্থ্যবান প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমানের উপর এটা ফরজ। হজ্ব অস্বীকারকারী কাফের।এই হজ্বের মাধ্যমে মানুষের দৈহিক ও আর্থিক ইবাদতের সমাবেশ ঘটে এই জন্য শরীয়তে এর গুরুত্ব অপরিসীম।
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে হযরত ইব্রাহিম (আ:) ও তার পুত্র হযরত ইসমাইল আঃ যখন কাবা ঘর নির্মানের কাজ সমাপ্ত করলেন তখন আল্লাহ তায়ালার নিকট এ বলে প্রার্থনা করলেন হে পরওয়ারদেগার তোমার অশেষ অনুগ্রহে আমরা তোমার ঘর পূর্ণ প্রতিষ্ঠার কাজ সমাধা করেছি।তুমি দয়া করে আমাদের এই খেদমতটুকু কবুল করে নাও।
আল্লাহ তায়ালা হযরত ইব্রাহিম আ: ও কিশোর হযরত ইসমাইল আঃ এর আন্তরিকতায় খুব খুশি হয়ে তাদের প্রতি নিজের সন্তোষ ঘোষণা করে হযরত ইব্রাহীম আ: নির্দেশ দিলেন: হে ইব্রাহিম! তুমি মানবজাতির মধ্যে আমার পক্ষ হতে ঘোষণা করে দাও তারা যেন এই ঘরে এসে হজ্ব পালন করে।( সুরা হজ্জ- ২৭) উত্তরে হযরত ইব্রাহিম আ:আরজ করলেন হে পরওয়ারদেগার আমি কিভাবে আপনার এই নির্দেশ সারা পৃথিবীর মানুষের মধ্যে ঘোষণা করব? আমি কি একা ঘোষণা দিলে সবার নিকট পৌছবে? আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ঘোষণা এলো আমি তোমাকে যা বলি তুমি তা করতে থাকো ঘোষণা করা হলো তোমার কাজ আর সে ঘোষণা মানুষের নিকট পৌঁছে দেওয়া হল আমার কাজ। আল্লাহ তাআলার এই হুকুম মোতাবেক হযরত ইব্রাহিম আ: উঁচু আওয়াজে পবিত্র হজ্বের ঘোষণা করে দিলেন।
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে হযরত ইব্রাহিম আ: এর সেই ঘোষণা আসমান ও জমিনের সকলে শুনতে পেয়েছেন এবং লাব্বাইক ( অর্থাৎ আমি হাজির আছি) বলেছেন।
অন্য এক হাদিসে বর্ণিত আছে হযরত মুহাম্মদ সা: এরশাদ করেন রুহু জগৎ থেকেও যারা হযরত ইব্রাহিম আ: এর সেই আওয়াজের উত্তরে লাব্বাইক বলেছেন দুনিয়ার জীবনে তারা অবশ্যই হজ্ব করবেন। আর যে ব্যক্তি যত বার লাব্বাইক বলেছেন তিনি ততবারে হজ্ব করার সৌভাগ্য লাভ করবেন।
হজ্জ মোট তিন প্রকার:১। হজ্বে ইফরাদ ২। হজ্বে কিরান ৩।হজ্বে তামাত্তু
হজ্বের ফরজ তিনটি
১। মিকাত থেকে ইহরাম বাঁধা।,
২।৯ই জিলহজ্ব আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা।
৩। ১০ ই জিলহজ সুবহে সাদিকের পর থেকে নিয়ে সূর্যাস্তের পূর্বে তাওয়াফে জিয়ারত করা।
হজ্বের ওয়াজিব ৬টি
১। ৯ ই জিলহজ্জ সূর্যাস্তের পর থেকে পরবর্তী সূর্যোদয় পর্যন্ত মুজদালিফায় অবস্থান করা।২।সাফা মারওয়া পাহাড়ের সায়ী করা।, ৩। মিনায় শয়তানকে কংকর নিক্ষেপ করা।, ৪।ইহেরাম খোলার জন্য মাথামুন্ডানো বা চুল ছোট করা।, ৫। বিদায়ী তাওয়াফ করা। ৬। কোরবানি করা।
হজ্বের সুন্নত ও মুস্তাহাব নয়টি।
১।যারা হজ্বে ইফরাদ কিংবা হজ্বে কিরান করবে তাদের জন্য তাওয়াফে কুদুম করা।
২।তাওয়াফে কুদুমের প্রথম তিন চক্করে রমল করা। তাওয়াফে কুদুমে রমল না করলে তাওয়াফের জিয়ারতের রমল করবে।
৩।৮ ই জিলহজ্জ মক্কা থেকে মিনায় গিয়ে যোহর আসর মাগরিব এশা ও ফজর এই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা এবং রাতে মিনায় অবস্থান করা।
৫। ৯ ই জিলহজ্জ সূর্যাস্তের পর আরাফার ময়দান থেকে মুজদালিফার দিকে যাওয়া।
৬।উকুফে আরাফার জন্য সেদিন যোহরের পূর্বে গোসল করা।
৭। ১০,১১,১২ই জিলহজ দিবাগত রাতগুলোতে মিনায় অবস্থান করা।
৮।মিনা হতে বিদায় হয়ে মক্কা আসার পথে মুহাসনাব নামক স্থানে কিছু সময় অবস্থান করা।
৯।ইমামের জন্য তিন স্থানে খুতবা দেওয়া। ৭ই জিলহজ্ব মক্কায় ৯ ই জিলহজ্ব আরাফায় ১১ই জিলহজ মিনায়।
হজ্বের ফজিলত সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু সালাম এরশাদ করেন :
যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার আদেশ পালনার্থে এবং তার সন্তোষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে হজ্ব পালন করে এবং সেই হজ্বের মধ্যে ছোট বড় সকল প্রকার গুনাহের কাজ হতে মুক্ত থাকে সে হজ্ব থেকে ফিরবে সেদিনের মতো যেদিন তার মা তাকে প্রসব করেছেন। (সহীহ বুখারী১৫২১)
অন্য এক জায়গায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সালাম এরশাদ করেন হজ্বে মাবরূর এর প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছুই নয়। ( মুস্নাদে আহমাদ: ৭৩৫৪)
হজ্বে মাবরূর এর অর্থ হলো গুনাহ মুক্ত নেকিপূর্ণ হজ্ব।
উলামায়ে কেরাম বর্ণনা করেন মাবরুর শব্দের অর্থ হল মাকবুল কোন প্রকার অন্যায় ত্রুটি-বিচ্যুতি ছাড়া সম্পূর্ণ নেকির সাথে যে হজ্ব করা হয় তা অবশ্যই আল্লাহ তায়ালার দরবারে গৃহীত হয়ে থাকে।
আরেক হাদীসে এসেছে – আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের খাতে অর্থ ব্যয় করলে যেমন একের বিনিময়ে ৭০০ গুন সাওয়াব পাওয়া যায় তেমনি হজ্বের খাতে অর্থ ব্যয় করলেও সে পরিমাণ সাওয়াব পাওয়া যায়।( মুসনাদে আহমাদ- ৩৮/১০৬)
শক্তি সামর্থ থাকা সত্ত্বেও যেসব পোড়া কপালের দল এত ফজিলতের মহামিলন ও মহতি সম্মেলনে যোগদান করে না তাদের সম্পর্কে নবীজি সা:বলেছেন কাবা শরীফ পর্যন্ত পৌছার সংগতি ও সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে হজ্ব করলো না সে হতভাগা ইহুদী হয়ে বা খ্রিস্টান হয়ে মারা গেল আমার কিছু আসে যায় না।( তিরমিযী :৮১২)
জাতি,বর্ন,বংশ নির্বিশেষে আমির ফকির দাড়িয়ে যাও এক কাতারে উঁচু নিচু ভেদাভেদ। সাম্য মৈত্রী ও ভ্রাতৃত্বের। আল্লাহর প্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে কোরবানি করো তোমার প্রিয় বস্তু। সেই সাথে কোরবানি করো তোমার কুপ্রবৃত্তি ওরিপুর তাড়না সকল কলুষতা থেকে মুক্ত হয়ে স্বচ্ছ স্কটিকতুল্য হোক তোমার হৃদয় মন। মহান আল্লাহ পাক যেন আমাদের সকলকে তার প্রেমের লীলানিকেতন পবিত্র কাবা গৃহের মাকবুল হজ্ব ও জিয়ারত নসিব করেন।আল্লাহুম্মা আমীন।।
লিখক
মো: মাহমুদ হাসান তোফায়েল, কলামিষ্ট,কওমী কণ্ঠ।